বিশেষ প্রতিবেদন

বিটাকের প্রশিক্ষণ মানেই চাকরি

বিটাকের প্রশিক্ষণ মানেই চাকরি

শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এমনকি অশিক্ষিত বেকারদেরও জীবনের আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক)। বিটাকের প্রশিক্ষণ মানেই চাকরি। বিটাক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেকার জীবনের তকমা ঘুচিয়ে আলোর পথে আসছেন নারী-পুরুষেরা। কেউ চাকরি করছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে, কেউবা নাসির গ্লাসে। দেশের ৩৩টি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান চলছে বিটাকের প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মীদের দিয়ে এবং প্রায় ছয় হাজার কর্মী কাজ করছেন এসব প্রতিষ্ঠানে।

‘দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভেঙে আমরা জেগে উঠবই’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু বিটাকের। প্রকল্পের নাম ‘হাতে কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণে মহিলাদের গুরুত্ব দিয়ে বিটাটের কার্যক্রম সম্প্রসারণপূর্বক আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচন’ (সেপা)। এ প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ পাওয়া বেশির ভাগই এখন চাকরিজীবী।

মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে রাজশাহীর ফরিদা ইয়াসমিন। নিজে কিছু করবেন—এমন শখের বশেই খোঁজ নিতে আসেন তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বিটাকের প্রধান কার্যালয়ে। তিন মাস আবাসিক প্রশিক্ষণ নেন সেপা প্রকল্পের অধীনে। প্রশিক্ষণ শেষে কেন্দ্রেই তাঁকে নিয়োগপত্র দেয় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। বর্তমানে নরসিংদীর পলাশে কারখানায় প্যাকেজিং ও পেইন্টিংয়ের কাজ করছেন তিনি।

ফরিদা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে মেয়েদের জন্য থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তা—সবই আছে। মাস শেষে নিয়মিত বেতনও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি ছয় মাস পরপর পরীক্ষা হয়, যার মাধ্যমে বেতন বাড়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা যারা বিটাকের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছি, সবাই ভালো করছি।’ তিন মাসের প্রশিক্ষণটা খুব কাজে দিয়েছে জানিয়ে ফরিদা বলেন, প্রশিক্ষণের আগে অনেকেই খুব বিপদে ছিল, এখন স্বাবলম্বী হয়েছে, পরিবারকেও সহায়তা করছে।

শরীয়তপুরের শম্পা আখতার, কিশোরগঞ্জের বীথি রানী বর্মণ, দিনাজপুরের খাদিজা বেগম—তিনজনই এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মী। এ রকম প্রায় ছয় হাজার নারী-পুরুষ এখন দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত। বিটাক থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন বেকার, জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগছিলেন।

জানা গেছে, প্রশিক্ষণ শেষে কেন্দ্রগুলোতেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মীরা এসে কর্মী বাছাই করে নিয়োগপত্র প্রদান করছেন। ফলে প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ পাওয়া জনবল সহজেই পাওয়া যায় না। এ কারণে আমরা বিটাক থেকে সরাসরি লোকবল নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছি। অন্য জনবল থেকে বিটাকের প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মীরা কাজের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে। তিন মাসের জীবনমুখী শিক্ষা তাদের এগিয়ে রেখেছে। এ কারণে আমাদেরও পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বিটাকের কর্মীরা।’

বিটাকের অতিরিক্ত পরিচালক ও সেপা প্রকল্পের পরিচালক মো. ইকবাল হোসাইন পাটোয়ারি বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই এখন স্বাবলম্বী। অনেকে পরিবারেও সহায়তা করছেন। অনেকে নিজেরাও কিছু করছেন। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।

বর্তমানে সেপা প্রকল্পের অধীনে নতুন ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নরসিংদীর সুমি আক্তার। তিনি বলেন, ‘এসএসসির ২৬০০ টাকা নিবন্ধনের ফি দেওয়ার সাধ্য বাবার ছিল না। ঋণ করে এসএসসি নিবন্ধন করেছি। পরে একটি কিন্ডারগার্টেনে চাকরি করে সেই ঋণ শোধ করেছি। তবে নিজে কিছু করার ইচ্ছে থেকেই বিটাকে এসেছি। নিজে কিছু করে পরিবারকে সহায়তা করতে চাই।’

বিটাক সূত্র বলছে, প্রশিক্ষণ নেওয়া ১ হাজার ৮৯৪ পুরুষ এবং ২ হাজার ১৮৯ নারীর চাকরি হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে। নাসির গ্লাসওয়্যার অ্যান্ড টিউবে কর্মরত আছেন ৩২৯ পুরুষ ও ২৩২ নারী। এ ছাড়া বেঙ্গল প্লাস্টিকে ১৭৮ পুরুষ ও ১১১ নারী, নিটল মোটরসে ১০ জন পুরুষ ও ১১ নারী, ফিলিপসে ১৮ পুরুষ ও ১৭ নারী, এএলএম স্টিল বিল্ডিং টেকনোলজিতে ৩৭ পুরুষ, শাহ সিমেন্টে ৪ পুরুষ ও ২০ নারী, আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ১২ পুরুষ ও ৪৪ নারী, ডেক্কো অ্যাকসেসরিজে ৬৬ পুরুষ ও ৭ নারী, বেক্সিমকো ফার্মায় ৩৬ নারী, ম্যাটাডোরে ২৮ পুরুষ ও ৪০ নারী, আবুল খায়ের গ্রুপে ৭ নারী নিয়োগ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৬৬৯ জন কর্মী নিয়েছে বিটাক থেকে।

বিটাকের পরিচালক সৈয়দ মো. ইহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষাবঞ্চিত দরিদ্র পরিবারের সদস্যরাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এ প্রশিক্ষণের পর বেকার শব্দটি ঘুচে যাচ্ছে তাদের জীবন থেকে। নতুন জীবন পাচ্ছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা। আমরা সেভাবেই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছি।’ প্রশিক্ষণের মান ভালো হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিটাকের কর্মী খোঁজে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী নেওয়ার জন্য চাহিদা দিয়ে রেখেছে।

কেন কর্মী নিতে বিটাকে আসছে প্রতিষ্ঠানগুলো—এমন প্রশ্নের জবাবে ইহসানুল করিম বলেন, প্রশিক্ষণ চলাকালীন সবাইকে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়। এরপর শুরু হয় প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের পদে পদে নিয়ম মেনে চলতে হয়। প্রতি শনিবার অনুষ্ঠিত হয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি। এতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সরকারি আমলাসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এসে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেন। এসব কর্মকাণ্ড তাঁদের জীবনধারায় পরিবর্তন এনে দেয়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিটাক থেকে কর্মী নিতে আগ্রহী।

প্রকল্পের বিবরণ: এ প্রকল্পের অধীনে নারীদের তিন মাস মেয়াদি ও পুরুষদের জন্য দুই মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিটাক। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য ২০০৯ সালের জুন মাসে এ প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পটি চলবে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। যেসব নারী বা পুরুষ অষ্টম শ্রেণি সম্পন্ন করেছেন, তাঁরাই প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ক্ষেত্র বিশেষে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি—এমন যে কেউ আবেদন করতে পারেন।

প্রশিক্ষণের সব ধরনের ব্যয় সরকার বহন করে। এককালীন যাতায়াত ভাতাও দেওয়া হয়। আবেদনপত্র বিটাকের তেজগাঁও প্রধান কার্যালয়, চট্টগ্রামে সাগরিকা রোডের কার্যালয়, খুলনার শিরোমণি শিল্প এলাকায় ও চাঁদপুর কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া বিটাকের ওয়েবসাইট থেকেও ফরম নিয়ে ডাকযোগে আবেদন করা যাবে।

নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় প্রধান কার্যালয়ে, পুরুষদের অন্য কার্যালয়গুলোতে। সেপা প্রকল্পের অধীনে গত জুন পর্যন্ত ১৭ হাজার ২৮০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর মধ্যে নারী ৭ হাজার ২০০ ও পুরুষ ১০ হাজার ৮০ জন।

'বাসার বাজার করেছেন তো? বাজার করুন চালডালে - সময় বাচাঁন, খরচ বাচাঁন। সেরা দামে সবকিছু মাত্র এক ঘন্টায়।'

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top